সাধারণত যারা কোনো কোম্পানির মৌলভিত্তি বিচার না করে কেবল হুজুগে পড়ে শেয়ার লেনদেন করেন, ট্রেন্ডের পেছনে ছোটেন কিংবা বাজারের বড় কোনো পরিবর্তনের পর দেরিতে প্রতিক্রিয়া দেখান, তাদের বোঝাতেই এ শব্দ ব্যবহার করা হতো।
তবে নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পুঁজি কোথায় খাটিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের বিনিয়োগের মুনাফা পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত জনপ্রিয় দুটি ইনডেক্স ফান্ড ‘এসপিওয়াই’ এবং ‘কিউকিউকিউ’-কেও ছাড়িয়ে গেছে। উল্লেখ্য, ফান্ড দুটির লক্ষ্যই হলো এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক ১০০-এর সমপরিমাণ মুনাফা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর চেয়েও বেশি সফল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গত নভেম্বরে আয়োজিত এক বিনিয়োগকারী শিক্ষা সম্মেলনে চার্লস শোয়াবের হেড ট্রেডিং ও ডেরিভেটিভস স্ট্র্যাটেজিস্ট জো মাজোলা বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে খুচরা বিনিয়োগকারীদের ডাম্ব মানি ভাবার সেই প্রচলিত ধারণাটি ভেঙে দিতে চাই। কারণ তারা এখন আর মোটেও অদক্ষ নন।’
আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটির ওই অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০০ জন গ্রাহক অংশ নেন।
দীর্ঘদিন ধরে অনেক মার্কিন নাগরিকই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে আসছেন, তবে তাদের বড় অংশই সরাসরি লেনদেনে না গিয়ে অবসরকালীন সঞ্চয় স্কিম বা ৪০১কে-এর মতো পরিচালিত ফান্ডের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু গত এক দশকে মোবাইল ট্রেডিং অ্যাপের আবির্ভাব, জিরো-কমিশন বা কমিশনমুক্ত লেনদেনের সুবিধা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক কমিউনিটি এবং অনলাইন শিক্ষা ও গবেষণার সহজলভ্যতা বিনিয়োগের চিত্র পাল্টে দিয়েছে।
এসব প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অন্যান্য খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে বা ‘ডু-ইট-ইয়োরসেলফ’ পদ্ধতিতে লেনদেন করার এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
করোনা মহামারীর লকডাউন ছিল খুচরা বিনিয়োগ খাতের একটি ইনফ্লেকশন পয়েন্ট বা সন্ধিক্ষণ। সে সময় রবিনহুডের মতো ইনভেস্টিং অ্যাপ ব্যবহারকারী একদল তরুণ ও নতুন বিনিয়োগকারীর আবির্ভাব ঘটে। তাদের হাত ধরেই শুরু হয় ‘মিম স্টক’ (কোনো একটি শেয়ার নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হঠাৎ হইচই শুরু হওয়া) উন্মাদনা, যা গেমস্টপ ও এএমসি এন্টারটেইনমেন্টের মতো সাধারণ কিছু কোম্পানির শেয়ারদরকে আকাশচুম্বী করে তোলে।
মিম স্টকের সেই হুজুগ সরিয়ে রাখলেও গত কয়েক বছরের শক্তিশালী শেয়ারবাজার মূলত সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলার একটি কার্যকর পটভূমি তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকটি কেবল তিনবার বার্ষিক লোকসানের মুখ দেখেছে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে বাজারের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরো বেশি মানুষকে বিনিয়োগের দুনিয়ায় টেনে এনেছে।
জেপি মরগান চেজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের শুরুর দিকে সঞ্চয়ী হিসাব থেকে বিনিয়োগ হিসেবে অর্থ স্থানান্তরের হার ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে আভাস দেয়া হয়েছে, নতুন প্রজন্মের অনেক আমেরিকান হয়তো বাড়ি কেনার সামর্থ্য না থাকায় সেই অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৩-২৫ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আসা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইন্টারেক্টিভ ব্রোকারসের প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ সোসনিক বলেন, ‘বর্তমানে বাজারের একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। আগে বাজার পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দখলে থাকত।’
ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনোর বাসিন্দা ফ্রাঙ্ক সাবিয়া ২০১৮ সালে প্রথম শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেন। গত কয়েক বছরে তিনি বিভিন্ন অনলাইন ইনভেস্টর চ্যাট গ্রুপে যুক্ত হয়ে ও চার্লস শোয়াবের মতো প্রতিষ্ঠানের সেমিনারে অংশ নিয়ে বাজার ও লেনদেন সম্পর্কে নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই নিজের ট্রেড বা লেনদেন খুঁজে নিই। আমার নিজস্ব কৌশল আছে।’
হাই স্কুল রেজিস্ট্রার সাবিয়া জানান, তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অন্যান্য সম্পদে লেনদেন করলেও তার আয়ের মূল উৎস বা ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ হলো অপশন ট্রেডিং। অপশন ট্রেডিং মূলত এমন এক ধরনের চুক্তি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে নির্দিষ্ট দামে কোনো শেয়ার কেনা বা বেচার সুযোগ থাকে।